বিগত সরকারের আমলে সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়া পর্যন্ত একটি নতুন ডুয়াল গেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদিত হয়। ভারতের ঋণে (লাইন অব ক্রেডিট বা এলওসি) প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ব্যয় ধরা হয় ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। মেয়াদ ধরা হয় ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। প্রকল্পটির মাধ্যমে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, বিস্তারিত নকশা তৈরির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জমির বেশির ভাগ অধিগ্রহণ করা হয়েছে। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এ প্রকল্পের অর্থায়ন থেকে সরে দাঁড়ায় ভারত। প্রকল্পটি এখন নতুন করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এ লক্ষ্যে একটি প্রাক-উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে সংস্থাটি। পিডিপিপিতে সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেলপথ নির্মাণে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ১০ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা।
নতুন পিডিপিপি তৈরির পাশাপাশি প্রকল্পটিতে অর্থায়নের জন্য বিনিয়োগকারীও খোঁজা হচ্ছে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) প্রকল্পটিতে ঋণ দিতে মৌখিকভাবে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে ব্যাংক দুটি রেলপথ মন্ত্রণালয় বা সরকারের অর্থনৈতিক বিভাগের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো চিঠি বা আগ্রহপত্র দেয়নি।
প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে অনুমোদিত হয় ‘বগুড়া হতে শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন, সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন ডুয়াল গেজ রেলপথ নির্মাণ’ প্রকল্প। শুরুতে মেয়াদ ২০২৪ সাল পর্যন্ত ধরা হলেও পরে তা বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন করা হয়। নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা ভারতের এক্সিম ব্যাংকের ঋণ। অবশিষ্ট ২ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা জোগান দেয় বাংলাদেশ সরকার, যা মূলত ভূমি অধিগ্রহণ এবং প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ আনুষঙ্গিক খাতে ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়।
রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালে এ প্রকল্পে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ পায় ভারতীয় প্রতিষ্ঠান রাইটস লিমিটেড ও আরভি অ্যাসোসিয়েটস আর্কিটেক্টস ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনসালট্যান্ট প্রাইভেট লিমিটেডের জয়েন্ট ভেঞ্চার। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রেলপথটির সমীক্ষা ও বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন করা হয়। ২০২৪ সালের আগস্টের পর ভারত অর্থায়ন থেকে সরে দাঁড়ালে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। বর্তমানে প্রকল্পটি নতুন করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
প্রকল্পের ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ ডুয়াল গেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আবু জাফর মিঞা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আগের ডিপিপি তৈরি করা হয়েছিল ২০১৮ সালে। এখন ২০২৫ চলছে। অর্থায়ন জোগাড়, নতুন ডিপিপি অনুমোদন, দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করতে আরো কয়েক বছর সময় লাগবে। অর্থাৎ এখানে প্রায় ১০ বছরের একটা ব্যবধান তৈরি হয়েছে। ১০ বছর আগের দাম আর এখনকার দামে তো অনেক পার্থক্য। এর সঙ্গে ভূমি অধিগ্রহণের জন্যও ব্যয় বেড়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এর আগে যখন প্রকল্পটির ডিপিপি অনুমোদন করা হয়, তখন কিন্তু কোনো সমীক্ষা হয়নি। এখন সমীক্ষা এবং নকশার ভিত্তিতে নতুন এ ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে।’
বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ৯০২ একর জমি প্রয়োজন হবে। এ জমি অধিগ্রহণে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ২ হাজার ২৪৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা। প্রকল্প কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে বেশির ভাগ জমি অধিগ্রহণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। অল্প যা বাকি আছে, তা দ্রুতই শেষ হবে। জমি অধিগ্রহণ হয়ে থাকায়, ঠিকাদার নিয়োগের পর প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খুব বেশি সময় লাগবে না বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা।
প্রসঙ্গত, বিদ্যমান রেলপথে ঢাকা থেকে বগুড়ার দূরত্ব প্রায় ৩২৪ কিলোমিটার। প্রকল্প সূত্র বলছে, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ সংযোগ রেললাইন নির্মিত হলে এ দূরত্ব কমে যাবে ১১২ কিলোমিটার। ফলে যাত্রীদের ভাড়া ও সময় কমে আসবে। প্রকল্পের আওতায় এমব্যাংকমেন্টসহ ৮৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার ডুয়াল গেজ মেইন লাইন, ৩৭ কিলোমিটার ডুয়াল গেজ লুপ ও ইয়ার্ড এবং স্টেশনসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।